Home » যীশু খ্রীষ্ট || jesus christ biography

যীশু খ্রীষ্ট || jesus christ biography

jesus biography in bengali

নাজারেথ নামে একটি গ্রামে জোসেফ নামে একজন কাঠমিস্ত্রি সপরিবারে বাস করত। নাজারেথ প্যালেস্টাইন রাজ্যের অন্তর্গত, এই গ্রামের প্রায় সমস্ত বাসিন্দা ছিল ইহুদি ধর্মাবলম্বী, এবং বেশিরভাগ ইহুদীরাই তখন বেদনাবিধুর। তার কারণ তখন তারা পরাধীন অবস্থায় এক অন্ধকার যুগ অতিক্রম করছিল।

আর কি হুতিদের এই পরাধীন অবস্থার কারণ ছিল রোমানরা। এই রোমান সাম্রাজ্য ছিল সুদূর বিস্তৃত। রোমান শাসকরা সাধারণত এবং আত্মাভিমানী হতেন। যে সময়ের কথা এখানে আমরা বলছি, সেই সময় ইহুদিদের একজন ধর্মগুরু ব্যাপ্টিস্ট নানা জায়গায় বলে বেড়াচ্ছেন, “শীঘ্রই ইহুদিদের মুক্তি দেওয়ার জন্য আবির্ভূত হবেন একজন মহান পুরুষ। তার হাত ধরেই আসবে নতুন যুগ, আপনারা সকলে প্রস্তুত হন তাকে বরণ করে নিতে”।

আর পাঁচজনের মতো এই কথা শুনে ছিলেন জোসেফ। মানুষ হিসেবে তিনি যেমন সথ তেমনি ছিলেন পরিশ্রমী, আচার-আচরণে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। এই সময় জোসেফ এর সঙ্গে ওই গ্রামেরই এক কুমারী মেয়ে মেরীর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। এই শুভ অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় সমাপ্ত হয়েছে।

এই সময় এক রাতে মেরি এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখল, তিনি দেখলেন ঈশ্বরের দূত গ্যাব্রিয়েল এসে তার মাথার পাশে বসেছেন। আর তাঁর হৃদয় হতে ভবিষ্যৎ বাণী ভেসে এল, “ আমি দেবদূত গ্যাব্রিয়েল আর কিছুদিনের মধ্যেই তুমি এক শিশুর জন্ম দেবে তুমি তার নাম রাখবে যিশু, তিনি ইহুদি জাতিকে এই পরাধীন জীবন থেকে মুক্ত করবেন।”

মেরি আতঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, আমার তো এখনো বিয়েই হয়নি আমি মা হব কিভাবে? দেবদূত অভয় দিলেন, “তোমার সেই সন্তান তো ঈশ্বরের পুত্র সুতরাং এ নিয়ে বিচলিত হবে না।” একথা জানিয়ে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেলেন গ্যাব্রিয়েল।

আর এই সময় ইহুদিদের রাজা হেরড তার রাজসভার জ্যোতিষীকে দিয়ে গণনা করিয়ে জানতে পারলেন, আর কিছুদিনের মধ্যেই কোন এক ইহুদি পরিবারে এমন একজন জন্মাবে। যে পরবর্তীকালে এই এলাকার রাজা হয়ে বসবেন। হেরড এই কথা জেনে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি আদেশ দিলেন বেথেলহেম ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে সকল পুরুষ নবজাতক শিশুকে যেন হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে মেরি তার দিদি এলিজাবেথকে নিজের অদ্ভুত স্বপ্নের কথা জানালেন। এলিজাবেথ ও তার স্বামী ছিলেন নিঃসন্তান তারা দুজনই একটি সন্তানের জন্য অন্তরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন সব সময়। এমন সময় তারাও স্বপ্নে এক দৈববাণী পেলেন, তাদের ঈশ্বর পুত্র সন্তান দেবেন তার নাম রাখবে জোহান। মানবজাতির অশেষ কল্যাণ করার জন্যই হবে জোহান এর আবির্ভাব।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই দৈববাণী সঠিক বলে প্রমাণিত হলো। এলিজাবেথ একটি সন্তানের জন্ম দিলেন, আর সেই নবজাতকের নাম রাখা হল জোহান। দিদির বাড়ি থেকে যখন নিজের বাড়ির দিকে ফিরে আসছেন, মেরি তখন অনুভব করতে পারলেন তিনিও সন্তানসম্ভবা। খবরটা জোসেফের কানে গেল তিনি মনে মনে খুব আঘাত পেলেন। মেরিকে বিয়ে করার জন্য তিনি খুবই আগ্রহে আকুল হয়েছিলেন। কিন্তু কোন সন্তান সম্ভাবনা দিকে তো বিয়ে করা সম্ভব নয়।

অল্প কিছু সময়ের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল জোসেফ কেও স্বপ্নে দেখা দিয়ে, তাকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার উপদেশ দিলেন। তিনি জোসেফকে বললেন, “মেরী কুমারি ও পবিত্র, ঈশ্বরের ইচ্ছায় জাতির পরিত্রাতা ওর গর্ভে স্থান নিয়েছেন মাত্র।”

জোসেফের মনে আর কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা রইলোনা। মেরির সঙ্গে জোসেফ এর বিয়ে হয়ে গেল। এরপর ধীরে ধীরে মেরি প্রসবকাল এগিয়ে আসছে বুঝতে পেরে জোসেফ স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলেন বেথেলহেম শহরের দি। পথে রাত ঘনালে তারা আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন এক আস্তাবলে। সেই রাতেই আস্তাবলে জন্মালেন ঈশ্বর পুত্র যীশু।

একদল রাখাল আকাশের বিশেষ এক তারার আলোয় উদ্ভাসিত হতে দেখে আস্তাবলে উপস্থিত হলেন। তারা নবজাতককে দেখে খুব আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করলেন। জন দা ব্যাপ্টিস্ট ও উপস্থিত হয়ে এই শিশুকে শনাক্ত করলেন, ইহুদি জাতির ভবিষ্যৎ মুক্তিদাতা হিসেবে।

ইহুদিদের একটা নিয়ম হল কোন শিশু জন্মাবার ৮ দিন পর মন্দিরে গিয়ে নবজাতকের নামকরণ করতে হয়। ঠিক সেভাবেই শিশুকে নিয়ে মন্দিরে গেলেন জোসেফ ও মেরি, নবজাতকের নাম রাখলেন যীশু। যীশু কে নিয়ে আরো কিছুদিন ওই আস্থাবলেই অবস্থান করেছিলেন তারা। এইসময় আকাশের আলো বিচ্ছুরণকারী একতারা কে অনুসরণ করে সেখানে উপস্থিত হলেন তিনজন প্রাচ্যদেশীয় পন্ডিত। তারা নানা রকম উপহার দিলেন যীশুকে।

অন্যদিকে হেরড এর কানে এসেছে যীশুর আবির্ভাবের কথা। তিনি নির্বিচারে শিশু হত্যায় মেতে উঠলেন। জোসেফ ও মেরি শিশুকে রক্ষা করার জন্য আত্মগোপন করলেন। ছদ্মবেশে উপস্থিত হলেন মিস। যীশুর জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর মিশরী অতিবাহিত হল। সময় কাটতে থাকলো আর এভাবেই একসময় রাজাকারদের মৃত্যু ঘটলো। এই খবর ক্রমে জোসেফের কানে গিয়ে পৌঁছায়। তিনি তখন মেরি যীশুকে নিয়ে নাজারেথ এ ফিরে এলেন।

যুবক হবার আগেই যীশু তার বাবার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজে হাত লাগাতে শুরু করেছিলেন। তিনি যে কাজেই হাত দিতেন সেই কাজের কলাকৌশল খুব সহজেই তার আয়ত্তে এসে যেত। যীশু ছিলেন একটু ভাবুক প্রকৃতির। বয়স যত বাড়তে থাকল তার ভাবনার গভীরতা ও বাড়তে থাকল।

মানুষের দুঃখ, বেদন, হাহাকার তাকে খুব যন্ত্রণা দিত। যীশু মর্মাহত হয়ে দেখলেন মানুষ কত যৎ সামান্য কারণেই একে অপরকে আঘাত করছে। তিনি যখন এই সমস্ত জিনিসের কারণ খুঁজে তার প্রতিকার করার উপায় বের করছিলেন। তখন দুটো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে।

প্রথম ঘটনা, হলো জুদিয়ার নতুন শাসক পন্তিয়াস পাইলেন সাধারণ মানুষদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনা এলিজাবেথ এর পুত্র জোহান ধর্ম গুরুপে রূপে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। আগেই জানিয়েছি এলিজাবেথ ছিলেন দিদি এবং তিনিও জোহানের জন্মের আগে দৈববাণী শুনতে পেয়েছিলেন। এই সময় যীশু জোহানের সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। জর্ডান নদীর তীরে দুজনের সাক্ষাৎ হয়।

সে এক মহৎ মিলন। জোহান একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে উন্মুখ অনেক নর-নারী । অনতিদূরে পবিত্র জর্ডান নদী প্রবাহমান। যীশু জর্ডান নদীর জলে স্নান সেরে জোহানের নিকট দিক্ষা নিলেন আর। সেই সময় যীশু শুনতে পেলেন এক দৈববাণী, “ধন-সাম্পদ ঐশ্বর্যাদি সমেত এই বিশ্বে তোমার ভূমিকা হবে মুক্তিদাতার। তুমি আমার প্রিয় এবং আমি তোমারই মধ্যে বর্তমান।”

যীশুর বয়স যখন প্রায় ৩০ বছর, তিনি সর্বসমক্ষে ঈশ্বরের বাণী প্রচারে ব্রতী হলেন। ইতিমধ্যে অত্যাচারী রাজা এন্তিপাস যীশুর গুরু জোহান কে কারারুদ্ধ করে ফেলেন। কারন তিনি রাজার কথা কে সমর্থন করেননি।

জোহানের অনুপস্থিতিতে যীশু ঈশ্বরের বাণী প্রচার করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কখনো তিনি নগরে, কখনো গ্রামে, কখনো সমুদ্রের তীর, কখনো বা আরোহন করেছেন পর্বত। সর্বক্ষণ তিনি সহিষ্ণু ও চলিষ্ণু। হাজার হাজার নরনারী মন্ত্রমুগ্ধের মতন তার কথা শুনতেন এবং তার অনুগামী হয়ে উঠতেন।

মানুষের পাপ গ্রানি ও কলুষতা থেকে মুক্ত করতে চলেছে তাঁর অবিস্মরণীয় পর্যটন। বহু অথর্ব বিবিধ রোগাক্রান্ত আতুর দুঃখভারাক্রান্ত নর-নারী যীশুর অলৌকিক স্পর্শে রোগ মুক্ত হলেন ও অন্তরে শক্তি পেলেন। যীশু কোন একটি স্থানে থাকতেন না।

তাঁ শীর্ষ সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই শীর্ষ দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জনকে তিনি বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাতেন ধর্ম প্রচার করার জন্য। এরা হলেন যেকাপ, অ্যানদ্রু, পিটার, জোহান, ফিলিপ, সিমন, জুডাস, জিহুদা, মথি, থোমা, বারথলমিও, জন । যীশু বললেন “মানুষকে ভালোবাসো। শত্রু মিত্র ভেদাভেদ করবে না। মানুষকে ভালোবাসলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।”

তিনি আরো বললেন “আমাকে অনুসরণ করো। তাহলেই ঈশ্বরের নিকট পৌঁছাতে পারবে। অন্যায় ও পাপ করা খুব সহজ, ভালো কাজ করে সৎ থেকে স্বর্গে যাওয়া তুলনামূলকভাবে অনেক কঠিন।”

যীশু যখন এইসব কথা প্রচার করছেন ইহুদীরা তখন ধর্মের নামে জাকের সঙ্গে নানা প্রকার অনাচার করে চলেছে প্রচুর পশু বলি দেওয়া হচ্ছে মন্দিরে মন্দিরে।

যীশু এসবের তীব্র বিরোধিতা শুরু করলেন। যারা মন্দিরে পশু বিক্রি করতে আসত তিনি তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুললেন। এ সমস্ত খবর রোমান শাসকদের কাছে পৌঁছালে তারা যীশুর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন।

এইরকম অবস্থায় কিছু মানুষ নিজেদের সংগঠিত করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, তারা বিশ্বাস করতেন যীশু তাদের পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত করবেন। কিন্তু রোমানরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করে। ইহুদিদের কয়েকজন ধর্মগুরু রোমান শাসকদের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানান, এই যীশু তার যথেষ্ট শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ করে আবহাওয়া কে সার্বিকভাবে বিষাক্ত করে তুলছে। যীশু আমাদের ধর্মকে অপমান করেছে। এককথায় যীশু ঈশ্বর বিরোধী । তার যীশুর উপযুক্ত শাস্তি চাই।

যীশুর ১২ জন শিষ্য ছিলেন তাদের নাম আগেই উল্লেখ করেছি। এদের মধ্যে জুডাস ছিলেন অর্থ লভি, সুতরাং শত্রুরা তাকে সহজেই কিনে নিল । আর জুডাস যীশু কে শত্রুর হাতে ধরিয়া দিল।

যীশুর বিচার হয় ইহুদীর এর যাজক আলোয়। প্রধান শাসক তাকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করলেন। যীশু নির্বিক। রোমান বিচারপতি প্লেনাউ সমর্থন করলেন সেই দণ্ডাদেশ। স্থির হলো যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হবে।

চারিদিকে হাহাকার উঠল। যীশুর চূড়ান্ত অমানবিক অত্যাচার সর্বসাধারণের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো। যীশুকে স্বয়ং বধ্যভূমিতে বহন করে নিয়ে যেতে হলো সেই ভারী ক্রুষ। মাঠকে করা হয়েছিল বদ্ধভূমি, অসংখ্য নারী-শিশু যীশুকে অনুসরণ করে উপস্থিত হলেন বধ্যভূমিতে। চারিদিকে করা প্রহরা।

এই সময় একজন চোর ও একজন ডাক্তার কেও সেই বধ্যভূমিতে আনা হয়েছিল ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বলে। একদল বিবেকহীন মানুষ হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আশ্চর্য ক্ষমাসুন্দর তিনি। সকলের দুঃখ নিরসন করতে এসেছিলেন তিনি, অবশেষে শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করে গেলেন। মৃত্যুর সময় সেই সমস্ত মুহূর্তগুলিকে ঈশ্বরের নিকট তার আমিও প্রার্থনা “ঈশ্বর এরা জানেনা কি করছে তুমি এদের ক্ষমা করো”।

যীশু খ্রীষ্ট মৃত্যুজয়ী তার বাণীতে রয়েছে মানব মুক্তির প্রকৃত সন্ধান ।বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ তাকে আঁকড়ে ধরে আছে তার বানী। এই অনুসরণকারীরা খ্রিস্টান রূপে পরিচিত।