Home » হজরত মুহাম্মদ এর জীবনী।। hazrat muhammad biography

হজরত মুহাম্মদ এর জীবনী।। hazrat muhammad biography

Biography Of Hazrat Mohammad In Bangla

তিনি সর্বোত্তম ও সর্বশেষ নবী।
মানবজাতির ইতিহাসে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা হযরত মুহাম্মদ এর আবির্ভাব এবং ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন। রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে প্রাচীন মরু প্রধান মক্কা নগরীতে তার আবির্ভাব। সেটা সম্ভবত 570 খ্রিস্টাব্দ। তিনি বিখ্যাত কোরাইশ বংশের সন্তান। পিতা হজরত আব্দুল্লাহ ও মাতা আমিনা। হজরত যে বিধাতার পাঠানো দূত হিসেবে এই পৃথিবীতে এসেছেন, একথা বহু আগেই মহাপুরুষরা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি শেষ পয়গম্বর। তার আবির্ভাব এর বহু পূর্বেই হজরত আদম, হজরত নূহ , হজরত মুসা, হজরত ইব্রাহিম প্রমূখ মহাজ্ঞানী হজরত মুহাম্মদ এর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। অধঃপতিত মানুষের উদ্ধার করার জন্য হজরত মুহাম্মদ পৃথিবীতে এসেছিলেন।
সে সময় আরব জাতির অবস্থা ছিল খুব শোচনীয়। নিজেদের মধ্যে হানাহানি দলাদলি লেগেই থাকত। চারিদিকে অনাচার লেগেই থাকত। খুনের বদলে খুন এটাই ছিল তাদের প্রচলিত রীতি। মিথ্যাচার, ব্যভিচার , চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ এই সমস্ত অপকর্মে আরবরা ছিল নিত্য অভ্যস্ত। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল বিশৃঙ্খলা তে ভরপুর। ধর্মের নামে গোচরে-অগোচরে নানা রকম শোষণ করা হত। তারা মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী ছিল। মনের খারাপ বাসনা চরিতার্থ করতে তারা যেকোনো রকম কাজ করতে পারত। এবং কুসংস্কারও ছিল পদে পদে। কাবা গৃহে ৩৬০ দেবদেবীর মূর্তি রক্ষিত ছিল, এই সমস্ত আরবরা সমবেত হয়ে এই সমস্ত মূর্তি পূজা করতো।
সমাজে মেয়েদের সম্মান বলে কিছু ছিল না। মেয়েদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে ধরা হত। সন্তানরা মায়েদের সম্মান ও করত না। মেয়েদের অপমান নিগ্রহ ও শোষণ করে পুরুষরা গর্ববোধ করত। বিবাহিত নারীকে যখন ইচ্ছা ত্যাগ করা যেত। একটি পরিবারে একটি নারীকে ওই পরিবারের বিভিন্ন পুরুষ ভোগ করত। এটা ছিল সাধারণ দৃষ্টান্ত। দেওয়া হত নরবলি ও। দাস ব্যবস্থা ছিল পুরোদমে।
এই অধঃপতিত জাতিকে এক সুসংহত সুশিক্ষিত জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন হজরত মুহাম্মদ। বাল্যকাল থেকেই হজরত মুহাম্মদ ছিলেন চিন্তাশীল। প্রচন্ড শব্দের মধ্যেও তিনি মনকে একাগ্র করতে পারতেন। কোনরকম হুড়োহুড়ি তার অভ্যাস বা স্বভাব বহির্ভূত ছিল। তার মন ছিল সহানুভুতিতে পরিপূর্ণ। অপরের দুঃখ কষ্ট তাকে বিচলিত করে তুলতো। হজরতের জন্মের আগেই তার বাবা দেহরক্ষা করেন। তার বয়স যখন ৬ মাস তার মা মারা যান। পিতা-মাতাকে হারা হজরত মুহাম্মদ কে লালন পালন করেন প্রথমে ঠাকুরদা আব্দুল মোতালির ও পরে পিতৃব্য আবু তালিবের কাছে।
তার বয়স যখন মাত্র 12 বছর তখন আবু তালিব তাকে নিয়ে যান সিরিয়ায়। তার এই সিরিয়া গমন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিরিয়াতে হজরত অনেক দেশি-বিদেশি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন, এবং বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তার ধারণা জন্মায়।
প্রথম জীবনে হজরতকে জীবিকার জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। পশুচারণ করার জন্য তৃণভূমি উপত্যকা পার্বত্য অঞ্চলে তাকে সারাদিন কাটাতে হতো। কাজের মধ্যেই তিনি আনমনা হয়ে থাকতেন। তিনি প্রকৃতিপ্রেমী ও ছিলেন।
ভোরের সিঁদুর গোলা সূর্য দেখে তিনি মুগ্ধ হতেন, আবার একই রকম ভাবে রাতের ভাসমান চাঁদ তাকে করতো উদ্দীপ্ত। মানুষের সঙ্গে তিনি সহজেই মিশতে পারতেন। তার সরলতা ও জ্ঞান সকলকে মুগ্ধ করত। কিন্তু কোথাও কোন অন্যায় হতে দেখলে তিনি তার প্রতিবাদ না করে পারতেন না। এ ব্যাপারে তার বলিষ্ঠতা ছিল অতীব লক্ষণীয়। তিনি মাথা নিচু করে অন্যায়কে মেনে নেওয়ার পাত্র ছিলেন না। এইসব গুণাবলীর জন্য স্বজাতির মধ্যে তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব পরিচিত হোন। কোরাঈশরা তাকে বিশেষ সম্মান জানিয়ে উপাধি দিয়েছিলেন আল-আমিন, অর্থাৎ অখন্ড বিশ্বাসী। বয়স্করা তাকে স্নেহের সঙ্গে সম্মান ও করতেন। ছোট বয়স থেকেই হজরত মুহাম্মদ এর সাংগঠনিক শক্তি ছিল বিস্ময়কর। তিনি বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন মানুষকে একত্রিত করতে পারতেন, কোন সৎ কাজ করবার জন্য। যে সমস্ত মানুষ তার সম্পর্কে আসতেন তারা প্রত্যেকেই এক অদ্ভুত অনুভূতি লাভ করতেন।
হজরত মুহাম্মদ এর বয়স যখন ১৭ বছর। তখন তিনি একটি সংগঠন গড়ে তোলেন তার নাম ছিল হিলফুল ফজুল । এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল সমাজ সংস্কার। হিলফুল ফজুল এর সদস্যরা যে সমস্ত কাজ করতেন, তা হল –
1. সমাজে যারা অসহায় নিপীড়িত তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন।
2. যেখানেই অন্যায় সেখানেই গড়ে তুলতেন প্রতিরোধ। অন্যায়কারীদের ভয় পাওয়া চলবে না, এটা তারা সব মানুষদের বোঝাতেন।
3. মজলুমের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তারা।
4. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে হানাহানি চলতো বা পারস্পরিক তীব্র আক্রোশে যে কাটাকাটি হত তার অবসান ঘটাতে হবে, এবং মানুষকে টেনে আনতে হবে শান্তির পথে। যে শান্তি প্রকৃত উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। তারা এটা সবাই কে বঝাতেন।
5. বিধবা নারীরা যাতে পরিবারে ও সমাজে লাঞ্ছিত না হন তা দেখতেন।
6. অরাজকতার হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হবে।

৪০ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ মক্কায় অবস্থিত এক ধনি বিধবা মহিলার ব্যবসায় কর্মরত হন। সেই মহিলার নাম ছিল খাদিজা। তার ব্যাবসা বহুদূর বিস্তৃত ছিল। এবং তার কাফেলা ও যেত দূরদূরান্ত পর্যন্ত।
খাদিজা হজরত মুহাম্মদের কর্মদক্ষতা ও সততা তে অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং তিনি মোহাম্মদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন। হজরত সেই প্রস্তাবএ সায় দিলে তাদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়। খাদিজা, হজরত এর থেকে বয়সে ১৫ বছর বড় ছিলেন। হজরত মুহাম্মদের সৎকর্ম ও ঈশ্বর ভাবনা অব্যাহত ছিল। সময় পেলেই তিনি উত্তর মক্কায় হেরা পর্বতে চলে যেতেন। সেখানকার একটি নির্জন গুহায় বসে তিনি তার উপাসনা করতেন। বিবাহের পর হজরতের আর আর্থিক অভাব ছিলনা, তখন তিনি সেই পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরো উপযোগী করে তুলেছিলেন ঈশ্বর আরাধনা। একদিন যখন হজরত সেই গুহায় ধ্যান করছেন তখন তিনি এক দৈব আদেশ পেলেন।
এই দৈব আদেশে বলা হল মূর্তি পূজা পাপের ই নামান্তর। মূর্তি পূজা বন্ধ করে আব্রাহাম প্রবর্তিত একেশ্বরবাদ কে আবার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের দায়িত্ব। “লা ইলাহা ইল্লাল্লা মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ” অর্থাৎ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। যারা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল, আল্লাহ তাদের আশীর্বাদ করেন। আল্লাহর দূত জিব্রাইল মারফত হজরত যখন এই আদেশ পেলেন, তখন তার বয়স ৪০, আর তখন থেকেই তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে ব্রতি হলেন। এই নতুন ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক সমস্ত বাধা বিপত্তি মুখোমুখি হলেন। বহুবার জীবন বিপন্ন হয়েছে। আল্লার অসীম করুণায় তিনি সেই সমস্ত বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। হজরত মোহাম্মদ নিকট সর্ব প্রথম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন তার পত্নি খাদিজা।
ক্রমে আরববাসী ইসলাম ধর্ম কবুল করতে থাকে দলে দলে। তখন হজরত কে খুন করার চেষ্টা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমন করলেন। মদিনার লোকেরা তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। হজরত কে কেন্দ্র করে মক্কা-মদিনা যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুসলমানরা জয়ী হলেন। হিজরী সনের রমজান মাসে হযরত 10 হাজার সৈনিক নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেন এবং দখল করে নেন। তার পর ইসলামে দীক্ষিত হল মক্কাবাসী। দিকে দিকে ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হল।
হযরতের কোন পুত্র সন্তান ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন নিজের তিন সুকন্যার জনক।
কার্যাদি সম্পন্ন করে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আওয়াল তারিখে হজরত মুহাম্মদ এই পৃথিবী ত্যাগ করে স্বর্গে গমন করেন।